প্রাণীদের মতো গাছেদেরও আছে বোধ, আছে বুদ্ধি

গাছেদেরও আছে বোধ ও বুদ্ধি

প্রাণীদের মতো গাছেদেরও আছে বুদ্ধিদীপ্ত জীবন। তারা তাদের চারপাশের সব কিছু টের পায়, বেঁচে থাকার পথে নানা সমস্যার সমাধান করে, যে কোনো অভিজ্ঞতা মনে রাখে, এমনকি একে অন্যের সাথে যোগাযোগও করে। এসব কথা শুনলে আপনার অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু ইতালীয় বিজ্ঞানি স্টেফানো ম্যানকিউসো দীর্ঘ গবেষণার পর গাছেদের সম্পর্কে এমনই সব সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। উদ্ভিদ-জীবনে বুদ্ধির প্রকাশ সম্পর্কে তার বক্তব্য সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছে।

গাছেদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা

অতীতে একসময় গাছেদের প্রাণ থাকার বিষয়টা সাধারণ মানুষ হেসে উড়িয়ে দিতো। পরে অবশ্য এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের মতো গাছেরাও জীবন্ত প্রাণ। আমাদের দেশের বিজ্ঞানি, অধ্যাপক জগদীশ চন্দ্র বসু গাছেদের মধ্যে প্রাণের নানা অভিব্যক্তি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিলেন। আজ বোধহয় আর কেউই গাছেদের প্রাণ থাকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবে না।

কিন্তু যদি বলা হয়, গাছেদের শুধু প্রাণ নয়, বুদ্ধিও আছে। তাহলে? সেক্ষেত্রে অনেকেই হয়তো ভুরু কুঁচকাবেন। তা কি করে সম্ভব? গাছেদের তো স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ক নেই। তাহলে গাছেদের বুদ্ধি ব্যাপারটা আসবে কোথা থেকে? অনুভূতি, স্মৃতি বা চেতনাই বা কোথা থেকে আসবে? এই সবই তো মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াফল।

গাছেদের সম্পর্কে নতুন ধারণা

গাছেদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা থেকে অনেকটা সরে এসে নতুন মত প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানি স্টেফানো ম্যানকিউসো। উদ্ভিদবিজ্ঞানের চর্চায় তিনি কোনো ভুঁইফোঁড় লোক নন। অনেকদিন ধরে তিনি ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত। গাছেদের স্নায়ুজীববিজ্ঞান (plant neurobiology) নিয়ে তার বহু বছরের গবেষণা। প্রাণীদের মতো কেন্দ্রীভূত স্নায়ুতন্ত্র না থাকলেও গাছেরা কীভাবে স্নায়বিক ক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে পারে সে বিষয়ে তার মত উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সম্প্রতি, অধ্যাপক ম্যানকিউসোর লেখা বই ‘The Incredible Journey of Plants’ (‘গাছেদের অবিশ্বাস্য যাত্রা’) সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছে। এই বইতে তিনি গাছেদের অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।

গাছেদের সচেতনতা

বুদ্ধিদীপ্ত জীবনের প্রথম শর্ত হলো সচেতনতা। অধ্যাপক ম্যানকিউসো মনে করেন, প্রতিটা গাছ তার নিজের ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন। একটা সহজ পরীক্ষার দ্বারা তিনি এটা প্রমাণ করেছেন। পরীক্ষাটা এরকম: ধরা যাক একটা গাছ, তার কান্ডের কোনো অংশ থেকে একটা পার্শ্বশাখা বেরোচ্ছে। এখন সেই কচি শাখাটার ওপর যদি অন্য গাছের ছায়া পড়ে, তাহলে সেটা দ্রুত বেড়ে জায়গা দখলের চেষ্টা চালাবে। কিন্তু যদি সেটার ওপর একই গাছের অন্য ডালের ছায়া পড়ে, তাহলে তার বৃদ্ধি হবে তুলনায় ধীর। যেনো গাছটা ভালো করেই জানে যে এ তার নিজেরই ছায়া, এখানে প্রতিযোগিতার কোনো দরকার নেই।

গাছেরা কি তাদের আশেপাশের পরিবেশ বুঝতে পারে? অধ্যাপক ম্যানকিউসো দেখিয়েছেন, গাছেরা তাদের দেহের সব অংশ দিয়ে পরিবেশকে অনুভব করতে পারে। তার মধ্যে কোনো কোনো অংশ আবার খুবই সংবেদনশীল। যেমন, মূলের অগ্রভাগ। বিজ্ঞানি জানাচ্ছেন, গাছের মূলাগ্র মাটিতে নানান খনিজ লবণের মাত্রা সহ অন্তত ২০টা প্যারামিটার টের পায়।

শুধু কি তাই, গাছেরা বিশেষ বিশেষ শব্দের কম্পনও টের পায়। বিশেষ করে ২০০ হার্জের কাছাকাছি কম্পাঙ্কের শব্দ গাছেরা খুব ভালোবাসে। প্রসঙ্গত এটাই হলো মাটির নিচে বয়ে যাওয়া জলের স্রোত থেকে উৎপন্ন শব্দের কম্পাঙ্ক। এই কম্পাঙ্কের শব্দের কোনো উৎস কোনো গাছের মূলের কাছে রেখে দিলে, মূল সেই উৎসের দিকে এগিয়ে যায়। পরীক্ষার দ্বারা এটা নিশ্চিত করেছেন অধ্যাপক ম্যানকিউসো।

গাছেদের স্মৃতিশক্তি

গাছেরা তাদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে। এই ব্যাপারটা অধ্যাপক ম্যানকিউসো লজ্জাবতী (Mimosa pudica) গাছের ওপর করা একটা বিশেষ পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করেছেন।

এই প্রজাতির গাছের পাতায় কোনো কিছুর ছোঁয়া লাগলে পাতাগুলো কিছুক্ষণের জন্য গুটিয়ে যায়। অধ্যাপক ম্যানকিউসো দেখিয়েছেন, এই গাছের পাতার ওপর জলের ফোঁটা পড়লে প্রথম প্রথম পাতাগুলো গুটিয়ে যায়। কিন্তু পরপর কয়েকবার জলের ফোঁটা পড়ার পর গাছটা যদি বোঝে যে এ থেকে ক্ষতির কোনো আশংকা নেই তাহলে এরপর জলের ফোঁটা পড়লেও পাতাগুলো আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

অধ্যাপক ম্যানকিউসো জানিয়েছেন, নিজের অভিজ্ঞতাকে লজ্জাবতী গাছ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। তিনি আরো জানিয়েছেন, গাছেদের গড় স্মৃতিশক্তি অনেক প্রাণীর থেকে বেশি (পোকাদের মনে রাখার ক্ষমতা গড়পড়তা ১ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে)।

গাছেদের বুদ্ধিদীপ্ত জীবনের নানা দিক

গাছেরা সারা জীবন পরিবেশের নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে বেঁচে থাকে। জীবনভর তাদেরকে বহুবিধ সমস্যার সমাধান করতে হয়। রীতিমতো যুক্তিসংগত ভাবে তারা এইসব সমস্যার সমাধান করে। গাছেরা তাদের আশেপাশে থাকা নিজ প্রজাতির, এমনকি ভিন্ন প্রজাতির গাছপালার সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম বলেও অধ্যাপক ম্যানকিউসোর অভিমত।

বিজ্ঞানি জানিয়েছেন, মাটির ওপরে ও নিচে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য গাছেরা নানা রকম জৈব-রাসায়নিক যৌগ ব্যবহার করে থাকে। এগুলো ছড়িয়ে তারা ক্ষতিকর পোকামাকড় ও হামলাকারী প্রাণীদের ব্যাপারে প্রতিবেশি গাছেদের সতর্ক করে দেয়। অনেক গাছ আবার বিচিত্র রাসায়নিক পদার্থের জাদুতে পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীদের ডেকে এনে তাদের দিয়ে পরাগসংযোগ বা বীজ বিস্তারের মতো দরকারি কাজগুলো করিয়ে নিতে দারুন পটু।

অন্যান্য গাছপালা ও প্রাণীদের দেহ থেকে বেরোনো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্র গাছেরা অনুভব করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একই জায়গায় বসবাসকারি গাছেদের মধ্যে কার্যত সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে জানাচ্ছেন অধ্যাপক ম্যানকিউসো।

গাছেদের বুদ্ধিদীপ্ত জীবনের রহস্য

কেন্দ্রীভূত স্নায়ুতন্ত্র না থাকা সত্ত্বেও গাছেদের জীবন কীভাবে বুদ্ধিদীপ্ত হয়, সেটা অধ্যাপক ম্যানকিউসো ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, গাছেরা যেহেতু একই জায়গায় সারা জীবন কাটায়, সেহেতু শাকাহারী প্রাণীদের দ্বারা তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা অনেক বেশি। এই অবস্থায় কেন্দ্রীভূত স্নায়ুতন্ত্র থাকলে তা গাছেদের বেঁচে থাকার পক্ষে সহায়ক হতো না। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের মৃত্যু অবধারিত হয়ে পড়তো। এই কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে গাছেদের দেহে কোনো কেন্দ্রীভূত স্নায়ুব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তার বদলে যেটা ঘটেছে সেটা হলো, স্নায়ুতন্ত্রের কাজগুলো গাছেদের সারা দেহে সব কোষে ছড়িয়ে আছে।

অর্থাৎ, সোজা কথায়, আলাদাভাবে স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্ক না থাকলেও, গাছেদের গোটা শরীরটাই একটা বিরাট বিকেন্দ্রীভূত স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে কাজ করে। তুলনা হিসেবে বলা যায়, ফুসফুস না থাকা সত্ত্বেও গাছেরা যেমন তাদের সারা দেহ দিয়ে শ্বাসক্রিয়া চালাতে সক্ষম, তেমনই মস্তিষ্ক না থাকা সত্ত্বেও গাছেরা তাদের সারা দেহ দিয়ে মস্তিষ্কের কাজগুলো করে নিতে সক্ষম। এটাই হলো গাছেদের বুদ্ধিদীপ্ত জীবনের গোপন রহস্য।

গাছেদের ‘মন’ বুঝতে মানুষের সমস্যা

উদ্ভিদজীবনের রহস্যগুলো বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের পক্ষে একটা বড়ো সমস্যা হলো গাছেদের অতিধীর পরিবর্তন। এর ফলে গাছেদের আচার-ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করাটা বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। অবশ্য এটাই যে একমাত্র কারণ তাও নয়। অধ্যাপক ম্যানকিউসো মনে করেন, আমাদের মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভের পথে বড়ো বাধা। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে আমরা মনে করি, মানুষই জীবজগতে সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্যান্য প্রাণীদের বোধ, বুদ্ধি, আবেগ, স্মৃতি, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে আমরা মোটেই গণ্য করি না। আর গাছেদের যে কোনো রকম বোধ-বুদ্ধি থাকতে পারে, এটা তো আমরা ভাবতেই পারি না।

অধ্যাপক ম্যানকিউসো এই মানব শ্রেষ্ঠত্ববাদকে মানুষের সবথেকে বড়ো ভ্রান্তি বলে মনে করেন। এই বদ্ধমূল ভ্রান্তি যে যুগ যুগ ধরে মানুষের দ্বারা গাছেদের অবমূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা নিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই অধ্যাপক স্টেফানো ম্যানকিউসোর। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মনে করার কোনো যুক্তিই মানুষের নেই। বরং বুদ্ধিমান গাছেরা যেভাবে প্রকৃতির সকল প্রাণের সাথে মিলেমিশে থেকে নিজেদের জীবনকে সার্থক করে তোলে তা থেকে শিক্ষা নিতে তিনি আমাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। [ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]