
জানেন কি, শহর কলকাতার বাসিন্দাদের ফুসফুসের গড়পড়তা স্বাস্থ্য গ্রাম বাংলায় বসবাসকারীদের তুলনায় সাত গুণ খারাপ। এর মূল কারণ হলো এই শহরের মারাত্মক বায়ুদূষণ। বাতাসে ভাসমান বিষাক্ত কণার বিচারে কলকাতা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটা। এই দূষণ আবার সবচেয়ে বেশি থাকে শীতের মরশুমে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি চার মাস। অন্য অনেক বড়ো শহরেও এটাই হয়। তাই এই সময়টাতে বায়ু দূষণ সম্পর্কে শহরবাসীদের একটু বেশি সাবধান থাকা দরকার।
বড়ো শহরের বায়ু দূষণ
প্রধান প্রধান দূষণকারি পদার্থ
কলকাতার মতো বড়ো বড়ো শহরগুলোর বায়ু দূষণে সবচেয়ে বেশি চিন্তা PM10 ও PM2.5 (পারটিকুলেট ম্যাটার টেন ও টু পয়েন্ট ফাইভ) কণাগুলো নিয়ে। এগুলো হলো বাতাসে ভাসমান নানারকম সূক্ষ্ম কণা। এদের ব্যাস যথাক্রমে ২.৫-১০ মাইক্রোমিটার এবং ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম। এছাড়া বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন ধাতুর কণা, যেমন লেড, ক্যাডমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, লোহা, জিংক ইত্যাদি অতি বিপজ্জনক। বড়ো বড়ো শহরের বাতাসে নাইট্রোজেনের অক্সাইডগুলোও প্রায়শই নিরাপদ মাত্রার থেকে বেশি থাকে। অন্যান্য বায়ু দূষকের মধ্যে আছে সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদি।
শহরে বায়ু দূষণের উৎস
বড়ো শহরগুলোতে বায়ু দূষণের দুটো প্রধান উৎস যানবাহন ও কলকারখানা। আমাদের দেশের যানবাহন অনেকাংশে পেট্রল চালিত, এগুলোর প্রযুক্তি পুরোনো আমলের। তার ওপর এখানকার রাস্তাগুলো ভীড়াক্রান্ত থাকায় যানবাহনের গতি কম। এসবই যান জনিত দূষণ বেশি হওয়ার কারণ।

যানবাহন ছাড়াও নানান কলকারখানার ধোঁয়া শহরের বায়ুকে ক্রমাগত দূষিত করে। উদাহরণস্বরূপ, কলকাতা শহরের কাছেই তিন তিনটে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এরা শহরকে বিদ্যুৎ ও বায়ু দূষণ দুটোই সাফল্যের সঙ্গে জোগান দিয়ে চলেছে। এছাড়া কলকাতার মধ্যে ও আশেপাশে রয়েছে বেশ কিছু ছোটো ও মাঝারি শিল্পের কারখানা। যেমন, লৌহ, বস্ত্র, প্লাস্টিক, জৈব ও অজৈব রাসায়নিক, রাবার ইত্যাদি। এই কারখানাগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই জ্বালানি হিসেবে কয়লা পোড়ানো হয়। এগুলোও বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস।
এ সবের পাশাপাশি শহুরে বায়ু দূষণের অন্যান্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করা যায়, নির্মান কাজ, শহরের অজস্র হোটেল-রেসটুরেন্ট, লন্ড্রি, শহরের উপকন্ঠে আবর্জনা পোড়ানো, ইত্যাদি।
বায়ু দূষণ জনিত ক্ষতি
বায়ুর সব ধরণের দূষণকারি পদার্থের মধ্যে পিএম টেন ও পিএম টু-পয়েন্ট-ফাইভ কণাগুলো দারুণ বিপজ্জনক। এগুলোকে আমাদের শরীর শ্বাসতন্ত্রের নিজস্ব ছাঁকনি দিয়ে আটকাতে পারেনা। ফলে এগুলো ফুসফুসের একেবারে ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বিশেষ করে পিএম টু-পয়েন্ট-ফাইভ কণাগুলো খুবই ক্ষতিকর। এগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে সূক্ষ্ম সেগুলো ফুসফুস পেরিয়ে রক্তে মিশে যায়। তারপর পৌঁছে যায় হার্ট, কিডনি, লিভার, এমনকি মস্তিষ্কেও। ঐ সব জায়গায় পৌঁছে গিয়ে এই কণাগুলো জমা হতে থাকে এবং বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দূষণ জনিত ক্ষতি সব মানুষের এক রকম নাও হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয় শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের। সাধারণভাবে দূষিত বায়ুতে থাকলে যে কারো কিছু স্বল্প মেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। উদাহরণ: অ্যালার্জি, চোখ জ্বালা, গলা ও শ্বাসনালির প্রদাহ, বমিভাব, মাথাধরা, ইত্যাদি। দীর্ঘ মেয়াদি কুফল হিসেবে থাকতে পারে হার্ট, ফুসফুস, কিডনি, ব্রেইন ও লিভারের বিভিন্ন রোগব্যাধি, এমনকি ক্যানসারও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য বলছে, সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ বায়ু দূষণ জনিত নানা ব্যাধিতে মারা যান। [আরো পড়ুন: বায়ু দূষণের কুফল সম্পর্কে এখনই সচেতন হোন]
বায়ু দূষণ শীতকালেই কেনো বাড়ে
কলকাতা এবং অন্য অনেক শহরে বায়ুর দূষণ সবচেয়ে বেশি থাকে শীতের মরশুমে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, এই চার মাস। এছাড়াও বিভিন্ন উৎসবের সময়, যেমন, দুর্গা পুজো, কালি পুজো/দেওয়ালি ও বর্ষবরণের সময় দূষণ সাময়িক ভাবে অনেকটা বেড়ে যায়। এর কারণ, ব্যাপক হারে বাজি ফাটানো।
শীতকালে বায়ু দূষণ বেড়ে যাওয়ার কিছু কারণ প্রাকৃতিক, কিছু কারণ মানবসৃষ্ট। সাধারণভাবে এ সময় বাতাস শুষ্ক থাকে, বৃষ্টি কম হয়, বাতাসের গতিও কম থাকে। এর ফলে রাস্তাঘাট ও উন্মুক্ত ভূমি থেকে বাতাসে ভাসমান কণার পরিমান বেড়ে যায়। আবার শীতের মরশুমেই প্রায় সমস্ত সেক্টরে তাপ উৎপাদনের জন্য কয়লা সহ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো অনেকটা বেড়ে যায়। এটাও শীতকালে বায়ু দূষণকে অনেকটা বাড়িয়ে দেয়।
চাই বাড়তি সাবধানতা
সবশেষে কলকাতা সহ বড়ো শহরের বাসিন্দাদের জন্য একটা কথা বলাই যায়। শীতকালে সোয়েটার, মাফলার পরে শুধু ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করলেই হবে না। এই মরশুমে বায়ু দূষণ থেকে নিজেদের আত্মরক্ষার বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে। এর জন্য যে শহরবাসীদের খানিকটা বাড়তি সাবধানতা বজায় রাখতে হবে, সে কথা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। [ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]