ইনডোর প্ল্যান্টের জরুরি কথা| গাছের যত্ন

ইনডোর প্ল্যান্টের গুরুত্ব বুঝে গাছের যত্ন নিতে হবে।

ইনডোর প্ল্যান্ট দিয়ে ঘর সাজানোর তুলনা হয় না। এসব গাছের অনেক গুণ। এরা ঘরের পরিবেশকে কেবল সুন্দরই করে না, দূষণও দূর করে। অধিকাংশ ইনডোর প্ল্যান্টের জন্য বিরাট কিছু খাতির যত্ন না লাগলেও কিছুটা মনোযোগ এই সবুজ বন্ধুরা আমাদের থেকে অবশ্যই আশা করে। ঘরে ইনডোর প্ল্যান্টের টব রাখতে চাইলে গাছের যত্ন সম্পর্কে কয়েকটা জরুরি কথা তাই মাথায় রাখা দরকার।

ইনডোর প্ল্যান্ট কেনার আগে গাছের যত্নের নিয়মগুলো জেনে নিন

গৃহশোভা বাড়ানো ছাড়াও ইনডোর প্ল্যান্টের আরেকটা বড়ো গুণ বায়ু শোধন। [Wikipedia] বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮০০ বর্গফুটের একটা বাড়িতে ১৫ থেকে ১৮টা গাছের টব রাখা উচিত। অর্থাৎ, প্রতি ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ফ্লোর এরিয়াতে একটা গাছ। পৃথিবীতে ইনডোর প্ল্যান্টের সংখ্যা কম নয়। স্নেকপ্ল্যান্ট, মানিপ্ল্যান্ট, অ্যালোভেরা, পিসলিলি, আন্থুরিয়াম, পোথোস, এরিকা, অ্যাগ্লোনিমা, জেডপ্ল্যান্ট, জারবেরা, ক্রোটন, আইভি, রাবার, ফার্নস,... রূপে-গুণে কেউ কারো চেয়ে কম নয়। তবে প্রতিটা ইনডোর গাছের যত্নের কিছু বিশেষ নিয়ম আছে।

ইনডোর প্ল্যান্টের যত্ন আত্তি সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কম থাকলে বলবো: নাম শুনেই ঘরে গাছের চারা নিয়ে চলে আসবেন না। পছন্দের গাছকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানোর আগে একটু জেনেবুঝে নিন। কোন পরিবেশে সেই গাছকে রাখতে হয় ও কীভাবে সেই গাছের যত্ন করতে হয়, এগুলো পরিচিত লোকদের থেকে বা নেট ঘেঁটে জেনে নিন। এর জন্য সোসাল মিডিয়ারও সাহায্য নেওয়া যায়। ফেসবুকে বাগানচর্চার অনেক গ্রুপ আছে। সেগুলোতে আপনি নানারকম ইনডোর প্ল্যান্টের বিবরণ ও গাছের যত্ন প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ লোকদের মতামত পেতে পারেন। [আরো পড়ুন: সেরা ইনডোর গাছ, যেগুলো খুব সহজে ঘরে রাখা যায়]

গাছ সংগ্রহের সময় সতর্ক থাকুন
ইনডোর প্ল্যান্টের ক্ষেত্রে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। গাছের চারা কেনার সময়ই ডাল-পাতা-কান্ড খুঁটিয়ে দেখে নিশ্চিত হোন যে সেটা সুস্থ-সবল। যে কোনো সতেজ ও রোগমুক্ত ইনডোর প্ল্যান্টের চারা সামান্য যত্ন পেলেই দ্রুত বেড়ে উঠবে ও আপনার চোখকে আনন্দে ভরিয়ে দেবে।

যে বিষয়গুলো ইনডোর প্ল্যান্টের যত্নে গুরুত্ব দিতে হবে

ঘরোয়া গাছের যত্ন প্রসঙ্গে আজ আমরা যে বিষয়গুলো আলোচনা করবো সেগুলো হলো—

  • গাছ রাখার জায়গা,
  • টব,
  • মাটি,
  • জল,
  • আলো,
  • রোগপোকা নিয়ন্ত্রণ,
  • প্রুনিং,
  • অন্যান্য।

গাছ রাখার জায়গা,

ইনডোর প্ল্যান্টের জায়গা ঠিক করা পরিকল্পনার অঙ্গ। আপনাকে এমন জায়গায় টব রাখতে হবে যেখানে গাছের জন্য যথেষ্ট আলোহাওয়া আসবে আর আপনারও গাছের যত্ন নিতে সুবিধা হবে। যেমন, বারান্দায় বা জানালার ধারে। গরম বস্তুর কাছে, এসি-ঘরে, টিভির ওপর কিংবা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় রাখলে, হাজার যত্ন নিলেও ইনডোর প্ল্যান্টের স্বাস্থ্যহানি ঘটবে। তাছাড়া, ঘনঘন জায়গা পাল্টালেও গাছের অসুবিধা হয়।

টব

উপযুক্ত আকার-আয়তনের টব নির্বাচন ইনডোর প্ল্যান্টের যত্নে একেবারে প্রাথমিক কর্তব্য। কোনো গাছের জন্য ছোটো টব হলেও চলে, আবার কোনো গাছের জন্য বড়ো টব দরকার হয়। টবে বাড়তি জল বেরোনোর ছিদ্র আছে কিনা সেটা অবশ্যই দেখে নেবেন।

মাটি

ইনডোর প্ল্যান্টের যত্নে মাটি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত দোয়াঁশ বা বেলে-দোয়াঁশ মাটি ঘরোয়া গাছের পক্ষে উত্তম। মাটি তৈরির সময় দরকার মতো জৈব সার মেশাতে হবে। সঠিকভাবে গাছের যত্ন নিতে হলে দু সপ্তাহ বাদে বাদে টবে অল্প পরিমানে জৈব সার দেওয়া উচিত। তাছাড়া প্রতিবছর ইনডোর প্ল্যান্টের টব ও মাটি বদলে দিতে হবে। সবুজমন-এ আমরা ইনডোর গাছের যত্নে রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহারের পক্ষপাতী নই।

জল

ইনডোর প্ল্যান্টের ক্ষেত্রে টবের মাটি শুকিয়ে গেলে গাছের ক্ষতি অনিবার্য। অন্যদিকে বেশি জলে গাছের শিকড় পচে যেতে পারে। ইনডোর গাছের যত্নে জলটা তাই হিসেব করেই দিতে হয়। রুটিন বেঁধে জল দেওয়ার বদলে মাটি পরখ করে জল দেওয়া ভালো। অর্থাৎ, চোখে দেখে ও আঙুলের ডগা ঘষে যখন বোঝা যাবে টবের মাটি শুকিয়ে আসছে, তখন গাছে পরিমিত জল দিতে হবে। জল দেওয়ার সেরা সময় ভোরবেলা ও সন্ধ্যাবেলা।

ট্যাপের জলে ক্লোরিন বা ফ্লুওরিন থাকলে সেই জল ইনডোর গাছে না দেওয়াই ভালো। একান্তই দিতে হলে, তা অন্তত একদিন আগে বালতিতে তুলে রেখে ওপরের দিক থেকে দিতে হবে।

আলো

ইনডোর প্ল্যান্টের যত্নে আলো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। সূর্যের আলো ছাড়া গাছ খাবার তৈরি করতে পারে না। আবার প্রখর রোদে অনেক গাছের ক্ষতি হয়। আলাদা আলাদা প্রজাতির গাছের আলোর চাহিদা আলাদা আলাদা। টবে নির্দিষ্ট প্রজাতির ইনডোর প্ল্যান্ট রাখলে সে যাতে দরকার-মতো সূর্যালোক পায়, তা অতি-অবশ্যই দেখতে হবে।

রোগপোকা নিয়ন্ত্রণ

সাধারণত সঠিক পরিবেশে রেখে ঠিকঠাক যত্ন নিলে ইনডোর প্ল্যান্টের স্বাস্থ্য এমনিতেই মজবুত থাকে। গাছের গায়ে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ দেখা দিলে রাসায়নিক বিষ প্রয়োগের বদলে জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করা ভালো। নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরতে পারলে, আক্রান্ত অংশ কেটে বাদ দিয়ে গাছকে বাঁচানো যায়। এছাড়া ক্ষতিকর পোকামাকড়দের দূরে রাখতে মাঝেমাঝে তামাকপাতা ভেজানো জল স্প্রে করে গাছের যত্ন নেওয়া যেতে পারে।

ইনডোর প্ল্যান্টের ডালে বা পাতায় কখনোসখনো স্কেল, মিলি বাগ বা মাইট জাতীয় পোকামাকড়ের আক্রমণ ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে গাছের আক্রান্ত অংশটা যত্ন সহকারে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এধরনের পরিস্থিতিতে নিম তেল প্রয়োগেও সুফল পাওয়া যায়। আরেকটা পদ্ধতি হলো রাবিং অ্যালকোহলে তুলো ভিজিয়ে আক্রান্ত অংশটা মুছে ফেলা। এই অ্যালকোহল ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়।

প্রুনিং

ইনডোর প্ল্যান্টের যত্নে কখনো কখনো প্রুনিং বা ছাঁটাই করার দরকার হতে পারে। সাধারণত গাছের আকার-আকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রুনিং করা হয়। এছাড়া গাছের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা বা রোগলাগা ডালপাতাও কেটে বাদ দেওয়া যেতে পারে। সব গাছে প্রুনিং দরকার হয় না।

অন্যান্য

মাঝে মাঝে স্প্রেয়ার দিয়ে জল ছিটিয়ে ইনডোর প্ল্যান্টের যত্ন নেওয়া যেতে পারে। এতে গাছ তরতাজা থাকে। তাছাড়া অনেক গাছের পাতায় ধুলো জমে যায়। জল ছিটিয়ে পাতাগুলো ধুয়ে দিলে সেগুলো ঝলমলে দেখায়।

একটুখানি যত্ন নিলেই আপনার ইনডোর প্ল্যান্ট ঝলমল করবে

ঘরে ইনডোর প্ল্যান্টের টব রাখলে যেমনতেমন করে ফেলে রাখা ঠিক নয়। এই গাছেরা আমাদের পরিবারেরই সদস্য। একটুখানি মনোযোগ আর পরিচর্যা ওদের অবশ্যই প্রাপ্য। তবে বেশিরভাগ ইনডোর প্ল্যান্টের চাহিদা বেশ কম, ওরা সামান্য যত্ন পেলেই খুশি থাকে।

একটা কথা মনে রাখবেন, মানুষ ও প্রাণীদের মতো প্রতিটা গাছের আছে নানান জৈবিক প্রয়োজন। আছে সুখদুঃখের অনুভূতি, ভালোলাগা-মন্দলাগা, পছন্দ-অপছন্দ। [আরো পড়ুন: প্রাণীদের মতো গাছেদেরও আছে বোধ, আছে বুদ্ধি] ঘরে ইনডোর প্ল্যান্টের টব রাখতে হলে তাই গাছকে ভালোবাসতে হবে, গাছের যত্ন নিতে হবে, তার মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। তবেই সেই গাছ সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে, স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যে ঝলমল করবে। [ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

ইনডোর প্ল্যান্টের চারা কিনুন, গাছের যত্ন নিন